বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, শাহজাদপুর, এনায়েতপুর এবং চৌহালী উপজেলার ঘরে ঘরে এই শিল্পের প্রসার ঘটে। এক সময় মসলিন বিলুপ্ত হলেও সেই কারুশৈলীর উত্তরসূরি হিসেবে সিরাজগঞ্জের তাঁতিরা তাদের দক্ষতাকে টিকিয়ে রেখেছেন যুগের পর যুগ।
বাংলার ম্যানচেস্টার বলার কারণঃ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, বেলকুচি এবং এনায়েতপুর এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সুবিশাল বস্ত্রশিল্পকে তার ঐতিহ্য এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে ‘বাংলার ম্যানচেস্টার’ বলা হয়। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহর যেমন একসময় বিশ্বের বস্ত্রশিল্পের প্রধান কেন্দ্র ছিল, সিরাজগঞ্জও তেমনি বাংলাদেশের তাঁত শিল্পের প্রাণকেন্দ্র।
সিরাজগঞ্জের তাঁত বস্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর গুণমান এবং বৈচিত্র্য। কেন এখানকার কাপড় সবার চেয়ে আলাদা?
বুনন শৈলী: এখানকার তাঁতিরা বংশপরম্পরায় কাপড়ের নকশা ও বুনন শিখে আসছেন। সুতার কাউন্ট ঠিক রেখে সূক্ষ্ম কাজ করতে তারা সিদ্ধহস্ত।
উপাদান: এখানে উচ্চমানের সুতি ও সিল্কের সুতা ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে জামদানি ছাপের শাড়ি, লুঙ্গি এবং গামছা এখানে অত্যন্ত যত্নে তৈরি হয়।
নকশা: ঐতিহ্যবাহী নকশার পাশাপাশি আধুনিক ফ্যাশন ট্রেন্ডের সাথে তাল মিলিয়ে এখানকার তাঁতিরা এখন আধুনিক ডিজাইনের তৈরি করছেন।
কোন ধরনের কাপড় এর জন্য বিখ্যাত
শাড়ি: বিশেষ করে সুতি শাড়ি, জামদানি এবং হাফ-সিল্ক শাড়ির জন্য সিরাজগঞ্জ বিখ্যাত। বেলকুচি, এনায়েতপুর এবং শাহজাদপুরের শাড়ি সারা দেশে জনপ্রিয়।
লুঙ্গি: বাংলাদেশের সিংহভাগ উন্নত মানের লুঙ্গি সিরাজগঞ্জে উৎপাদিত হয়। এখানের তৈরি লুঙ্গি টেকসই এবং আরামদায়ক হওয়ার কারণে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
গামছা: সাধারণ ব্যবহারের জন্য উন্নত মানের সুতি গামছা এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান পণ্য।
থান কাপড় ও চাদর: শীতকালীন মোটা চাদর এবং বিভিন্ন ধরনের থান কাপড়ও এখানে প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয়।
কর্মসংস্থান: সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয় এই শিল্পে।
তাঁত সংখ্যা: জেলাজুড়ে প্রায় ১ লক্ষ ৩৫ হাজারেরও বেশি তাঁত সচল বা অচল অবস্থায় রয়েছে।
তাঁতি পরিবার: প্রায় ১৪,৮৭০টি পরিবার এই পেশার সাথে যুক্ত।
শ্রমিক: প্রতিটি তাঁতে সুতা তৈরি, রং করা ও কাপড় তৈরির কাজে ২-৩ জন করে শ্রমিক কাজ করে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ বস্ত্র চাহিদার একটি বিশাল অংশ পূরণ করে হস্তচালিত ও বিদ্যুৎচালিত এই তাঁত শিল্প।
বাংলাদেশের মোট তাঁতজাত পণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ উৎপাদিত হয় সিরাজগঞ্জে।
দেশের মোট উৎপাদিত কাপড়ের একটি বড় অংশ (প্রায় ৩৫-৪০%) এই অঞ্চল থেকে আসে।
হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় এই জেলাকে কেন্দ্র করে, যা দেশের জিডিপিতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে।
ঐতিহ্যবাহী এই কাপড়ের দর- দাম
আপনি যদি পাইকারি বা খুচরা মূল্যে সেরা মানের তাঁত পণ্য কিনতে চান, তবে সিরাজগঞ্জ হলো আপনার গন্তব্য। এখানে উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় কাপড়ের হাটগুলো বসে।
এটি দেশের অন্যতম বড় কাপড়ের বাজার। মূলত সুতি শাড়ি ও লুঙ্গির জন্য এটি বিখ্যাত।
হাট বার: প্রতি রবিবার ও সোমবার।
মানসম্মত শাড়ি এবং আধুনিক ডিজাইনের কাপড়ের জন্য এনায়েতপুর বিখ্যাত। দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা এখানে আসেন।
হাট বার: প্রতি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার।
লুঙ্গি ও গামছার জন্য বেলকুচির কোনো বিকল্প নেই। এখানকার স্ট্যান্ডার্ড লুঙ্গি ও শাড়ি সারা দেশে সমাদৃত।
হাট বার: প্রতি বুধবার ও শনিবার।
সবকিছুর পরও সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প আজ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে। সুতার উচ্চমূল্য, রঙ ও রাসায়নিকের দাম বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এই শিল্পকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করছে। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে এই শিল্প কেবল দেশের চাহিদা নয়, বিদেশেও বিশাল বাজার তৈরি করতে পারে।
প্রত্যাশা-
সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প আমাদের শেকড়ের পরিচয়। এই খটখট শব্দে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের ঘাম আর স্বপ্ন। ‘বাংলার ম্যানচেস্টার’ খ্যাত এই জেলাটি আমাদের অর্থনীতির অন্যতম বড় স্তম্ভ। আপনি যদি বাঙালি সংস্কৃতির খাঁটি স্বাদ নিতে চান, তবে একবার সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লী ঘুরে আসা এবং এখানকার কারিগরদের নিপুণ হাতের কাজ সংগ্রহ করা উচিত।