ঘিয়ের খাঁটিত্ব পরীক্ষা নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক প্রচলিত পদ্ধতি রয়েছে, যার অনেকগুলোই বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন। তাই ঘি চেনার উপায় নিয়ে কিছু মোলিক বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো:
ঘি কেমন হবে এর মূল প্রভাবক দুটি-১। দুধের মান ২।কারিগর (যিনি ঘি বানাবেন)
ঘিয়ের মূল উৎস হলো দুধের ফ্যাট বা চর্বি। গাভীর দুধের মান যত ভাল হবে ঘি এর মান ততই ভাব হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে ঘি তৈরির সময় তাপ নিয়ন্ত্রণই আসল কারিশমা যে কাজটি ঘি কারিগরের হাতে ।ঘি তৈরির সময় জালের (তাপ) পরিমাণের ওপর এর রঙ এবং সুগন্ধ অনেকাংশেই নির্ভর করে। জালের তাপ কম বা বেশি হলে ঘিয়ের রঙ ও স্বাদে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। এছাড়াও সময়, কড়াই ও চুলার ইত্যাদির কারনে ঘি এর ফ্লেভার ,কালার ও স্বাদের তারতম্য হয়। যেমন-
ঘিয়ের মূল উৎস হলো দুধের ফ্যাট বা চর্বি।
গাভীর খাদ্য: গরু যদি সবুজ ঘাস বেশি খায়, তবে সেই দুধে 'বিটা-ক্যারোটিন' বেশি থাকে, যা ঘিকে প্রাকৃতিকভাবে হলুদাভ করে। অন্যদিকে খড় বা দানাদার খাবার খাওয়া গরুর দুধের ঘি সাদাটে হয়।
ফ্যাটের পরিমাণ: দেশি গরুর দুধের ফ্যাটের গঠন আলাদা হয়, যা ঘিয়ের দানাদার (Granular texture) ভাব নিশ্চিত করে। দুধ যত খাঁটি হবে, ঘি তত বেশি সুগন্ধি হবে।
এজন্য সিরাজগঞ্জ জেলার বাঘাবাড়ীর ঘি ভালো হয়। কারণ এই এলাকার দুধের মান ভাল হয়।
ঘি তৈরির সময় তাপ নিয়ন্ত্রণই আসল কারিশমা।
অল্প আঁচ: ঘি সবসময় হালকা থেকে মাঝারি আঁচে জ্বাল দিতে হয়। খুব বেশি তাপে দুধের প্রোটিন পুড়ে যায়, ফলে ঘিয়ের স্বাদ তিতা হয়ে যেতে পারে এবং রং কালচে হয়ে যায়।
কড়া জাল (High Heat): ঘি তৈরির সময় কড়া জ্বাল বা অতিরিক্ত জ্বাল দিলে ঘিয়ের রঙ গাঢ় সোনালী বা বাদামী হয়ে যায়। এছাড়া কড়া জ্বালের কারণে ঘি থেকে একটি বিশেষ সুমিষ্ট ঘ্রাণ ও কড়া স্বাদ পাওয়া যায়।
ক্যারামেলাইজেশন: আগুনের তাপে দুধের ল্যাকটোজ এবং প্রোটিনের মধ্যে 'মেইলার্ড রিঅ্যাকশন' (Maillard reaction) ঘটে। এই রাসায়নিক বিক্রিয়াই ঘিকে তার সিগনেচার বাদামি রং এবং চমৎকার ঘ্রাণ দান করে।
জ্বালের ফলে ঘিয়ের টেক্সচার: কড়া জালে ঘিয়ের পরিমাণ কমে যায় এবং ঘন হয়ে যায়, যা অনেক দিন পর্যন্ত ভালো থাকে।
পোড়া ঘি: যদি ঘি অতিরিক্ত বাদামী বা কালো রঙের দেখায়, তবে বুঝতে হবে এটি অতিরিক্ত জ্বালের কারণে পুড়ে গেছে।
জলীয় অংশ অপসারণ: ঘি ততক্ষণ জ্বাল দিতে হয় যতক্ষণ না জলীয় অংশ সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত হয়। জলীয় অংশ থেকে গেলে ঘি দ্রুত নষ্ট বা পাঙ্গাস (Mold) ধরে যেতে পারে।
সঠিক সমাপ্তি: সময় কম হলে ঘি কাঁচা থেকে যাবে এবং দানাদার হবে না। আবার সময় বেশি হলে ঘি অতিরিক্ত পুড়ে যাবে। যখন ঘি স্বচ্ছ হয়ে আসে এবং ফেনা কমে নিচে বাদামি তলানি (Kheer) জমে, তখনই নামিয়ে নিতে হয়।
পাত্রের উপাদানের ওপর ঘিয়ের গুণাগুণ অনেকটা নির্ভর করে।
লোহার কড়াই: ঐতিহ্যগতভাবে লোহার কড়াই ব্যবহার করা হয়। এটি সমানভাবে তাপ ছড়ায়, যা ঘিকে ভালো করে ফুটতে সাহায্য করে। তবে এতে ঘি কিছুটা গাঢ় রঙের হতে পারে।
স্টেইনলেস স্টিল বা মোটা তলার পাত্র: আধুনিক সময়ে মোটা তলার স্টিলের পাত্র ভালো, কারণ এতে নিচে পোড়া লাগার ভয় কম থাকে।
অ্যালুমিনিয়াম: অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র এড়িয়ে চলাই ভালো, কারণ উচ্চতাপে এটি চর্বির সাথে বিক্রিয়া করতে পারে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
এছাড়াও বিভিন্ন সমীক্ষা ও পত্র-পত্রিকা ঘাটাঘাটি করলে ঘি চেনার কিছু প্রচলিত উপায় পাওয়া যায় এগুলো কিছু তুলে ধরা হল-
স্বাদ পরীক্ষা: অল্প পরিমাণ ঘি নিন এবং স্বাদ নিন। খাঁটি ঘির স্বাদ অনেকটা বাদামের মতো। এবং এটা খাওয়ার পর মুখে লেগে থাকবে না। অন্যদিকে ভেজাল ঘি খাওয়ার পর মুঝে ডালডার মতো লেগে থাকবে।
গরম পানি পরীক্ষাঃ কোনও পাত্রে গরম জল করে তার মধ্যে ঘিয়ের শিশি বসিয়ে দিন। ভিতরের ঘি গলে যাবে।
ফ্রিজে রাখুন: ঘি খাঁটি কিনা তা দেখার জন্য একটি কাছের পাত্রে কিছুটা ঘি নিয়ে সেটি ফ্রিজে রেখে দিন। খাঁটি ঘি পুরোটাই সমান ভাবে শক্ত হয়ে যাবে কিন্তু ঘি যদি ভেজাল হয় তাহলে ওপরে একটি আলাদা স্তর তৈরি হবে।
গরম করুন: কম আঁচে একটি প্যানে এক টেবিল চামচ ঘি গরম করুন। খাঁটি ঘি হলে তা দ্রুত গলে পরিষ্কার তরলে পরিণত হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি ঘি গলে যেতে বেশি সময় নেয়, বা অবশিষ্টাংশ ফেলে যায়, তাহলে ঘি ভেজাল হতে পারে।
চুলায় গরম করে পরীক্ষা
একটি পাত্রে এক চামচ ঘি দিয়ে চুলায় গরম করুন। যদি ঘি দ্রুত গলে যায় এবং গাঢ় খয়েরি রঙ ধারণ করে, তবে এটি খাঁটি। কিন্তু যদি ঘি গলতে দেরি হয় এবং রঙ হালকা হলুদ থাকে, তবে বুঝবেন এতে ভেজাল আছে।
পরামর্শ: সবসময় পরিচিত বা বিশ্বস্ত উৎস থেকে ঘি সংগ্রহ করার চেষ্টা করুন। কারণ রাসায়নিক ভেজাল অনেক সময় সাধারণ ঘরোয়া পরীক্ষায় ধরা নাও পড়তে পারে।